নদীয়া জেলার সংশোধনাগারগুলিতে ভ্রাম্যমান গ্রন্থাগার পরিষেবার বর্ষ পূর্তি  ঃ একটি পর্যালোচনা

তেহট্ট সংশধনাগারে পুস্তক দেওয়া হচ্ছে আবাসিকদেরতেহট্ট সংশধনাগারে পুস্তক দেওয়া হচ্ছে আবাসিকদের

[] সঞ্জিত দত্ত

জেলার গ্রন্থাগার গুলি থেকে ভ্রাম্যমান পাঠক পরিষেবা বন্ধ হয়ে গেছে বহুদিন । এককালে জেলা গ্রন্থাগার থেকে জেলার বিভিন্ন ছোট গ্রন্থাগারে গাড়ি করে বই পৌঁছে দেওয়া হত সেখানকার গ্রন্থাগারের পাঠকদের জন্য। এক সময় তা বন্ধ হয়ে গেল। গাড়ির চালকের পদটিই তুলে দেওয়া হল । সাইকেলে করে গ্রামের বাড়ি বাড়ি বই পৌঁছানোর কথা মানুষ ভুলেই গেছেন । ‘সাইকেল পিওন’পদ এখন নেই। গ্রন্থাগার কিন্তু আছে। পরিষেবা বাড়ানোর নানা চেষ্টাও আছে। ৩১ আগস্ট ২০১৭ নদীয়া জেলায় এইরকম একটি নব্য প্রচেষ্টার বর্ষ পূর্তি হল ।

গ্রন্থাগার বিজ্ঞানী ড.এস.আর.রঙ্গনাথনের ‘গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের পঞ্চনীতি’তে (Five Laws of Library Science) বই এবং পাঠকের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি সুন্দর ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে । ১.বই ব্যবহারের জন্য (Books are for use) ২. প্রত্যেক পাঠকের জন্য বই (Every reader his / her book) ৩. প্রত্যেক বইয়ের জন্য পাঠক (Every book its reader)। এই তিনটি সূত্রে বই ও পাঠক একে অপরের পরিপূরক এবং অপরিহারয্য অঙ্গ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি চতুর্থ সূত্রে বলা হয়েছে পাঠকের সময় বাঁচান (Save the time of the reader)যেখানে পাঠক পৌঁছাতে পারবেন না সেখনে বই পাঠকের কাছে পৌঁছে যাবে। এই ছিল মূল কথা। ভ্রাম্যমান পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার দীর্ঘদিন পর গত বছর নদীয়া জেলায় এই প্রথার আংশিক পুনঃ উদ্ধারে একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ছোট গ্রন্থাগারে এখন বই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।অভাব কম।তা ছাড়া গাড়ি,সাইকেল নেই। কর্মী ঘাটতি আছে। কিন্তু জেলার চারটি স্থানে বেশ কিছু মানুষ পুস্তক পাঠে বঞ্চিত, তাঁরা আসতে পারেন না। এঁদের জন্যই ‘নব্য প্রচেষ্টা’।

সোজাসাপ্টা বলা যায় কৃষ্ণনগর, রাণাঘাট, কল্যাণী ও তেহট্ট’এই চারটি জনপদে মোট পাঁচটি সংশোধনাগার তথা হোম রয়েছে । সেখানে আবাসিকের সংখ্যা ৫০০ থেকে ৮০০ । সংখ্যাটা সময় বিশেষে কমবেশী হয় । এই আবাসিকদের জন্য ভ্রাম্যমান গ্রন্থ পরিষেবা চালু করা হয় ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট ‘সাধারণ গ্রন্থাগার দিবসে’।

এতো গেল উদ্বোধনের কথা, তারপর কি খবর তার ?

হ্যাঁ, এখনও নিয়মিতভাবে সংশোধনাগারের আবাসিকদের কাছে বই পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে ।১৫ থেকে ২১ দিন অন্তর বই বদলের কাজটি করা হয় । মূলত হাল্কা গল্প উপন্যাস, রম্য রচনা, হাসির গল্প, ধর্মদর্শন, ভ্রমণ কাহিনি, শিকার কাহিনি ইত্যাদি বিষয়ের বই তাঁদের পড়তে দেওয়া হয় ।একমাত্র তেহট্ট উপ-সংশোধনাগারে গ্রন্থের সঙ্গে রঙিন পত্রপত্রিকা পাঠানো হয় । এখানে বেশ কিছু আবাসিক গ্রন্থের চেয়ে ম্যাগাজিন পড়তে পছন্দ করেন- ছবি দেখেন । নগেন্দ্রনগর হোম থেকে চিত্রে জাতকের কাহিনি, অমর চিত্রকথা , চিত্রে রামায়ণ মহাভারত জাতীয় ছবির বই চাওয়া হয়েছিল । নবসাক্ষর বা শিক্ষায় পিছিয়ে পড়াদের জন্য এইসব ছবির বই খুব কাজের । কৃষ্ণনগর জেলা সংশোধনাগার থেকে কয়েকবার শেলী, কিটস, বায়রন’দের বঙ্গানুবাদ সহ কবিতার বইয়ের ডিমান্ড এসেছে । গ্রন্থ নির্বাচন/বাছাই করেন গ্রন্থাগার কর্মীরাই । তেহট্টের ক্ষেত্রে গ্রন্থাগারকর্মীর সঙ্গে সংশোধনাগার কন্ট্রোলার মহাশয় নিজেও গ্রন্থাগারের উন্মুক্ত তাক থেকে বই বাছাই করে থাকেন । প্রকৃতপক্ষে আবাসিকদের মধ্যে নিরক্ষর থেকে উচ্চ শিক্ষিত নানা রকমের, নানা বয়সের মানুষ রয়েছেন ।তাঁদের চাহিদা নানা ধরণের ।আবার সব আবাসিক বই পড়ুয়াও নন বা আগ্রহ কম । গ্রন্থাগারকর্মীরা তাঁদের পেশাগত অভিঞ্জতার ভিত্তিতে আন্দাজে বই বাছাই কাজটি করে থাকেন । ১০ থেকে ৩০ টি গ্রন্থ প্রতিবারে সংশোধনাগারে পাঠানো হয় । অর্থাৎ সারা জেলায় পাঁচটি স্থানে মোট ১০০ থেকে ১৫০টি পুস্তক ও ১০ থেকে ২০টি ম্যাগাজিন প্রতিবার আবাসিকগণ পেয়ে থাকেন । কল্যাণী(কল্যাণী পাবলিক লাইব্রেরী ,শহর গ্রন্থাগার), রাণাঘাট (আনুলিয়া কেদারনাথ স্মৃতি গ্রামীণ গ্রন্থাগার) ও কৃষ্ণনগরে (নদীয়া জেলা গ্রন্থাগার) গ্রন্থাগারকর্মীরাই গ্রন্থ সংশোধনাগারে পৌঁছে দেন । জেলা গ্রন্থাগারে এজন্য টোটো গাড়ি ভাড়া করা হয় ।একসময় জেলা গ্রন্থাগারের কর্মীকে ব্যক্তিগত সাইকেলে করেও বই হোমে পৌঁছে দিতে দেখা গেছে । অন্যান্য ক্ষেত্রে কখনও কখনও সংশোধনাগার থেকে কারা বিভাগের কর্মীরা গাড়ি নিয়ে এসে বই নিয়ে বা দিয়ে যান। একমাত্র তেহট্টে কারা বিভাগের কর্মীর সঙ্গে প্রতিবার আধিকারিক নিজে তেহট্ট নবারুণ পাঠাগারে এসে বই আদান প্রদান করেন ।

আবাসিকদের কারাবাসের মেয়াদকাল সমান নয় । তাছাড়া সবার শিক্ষার মান সমান নয় । ফলে পুস্তকের প্রতি সমান আকর্ষণ তাঁদের থাকে না ।যারা লেখাপড়ায় একটু পিছিয়ে তাঁরা পত্রিকা পছন্দ করেন । অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে আবাসিকরা একে অন্যের সঙ্গে কোন বই নিয়ে আলোচনা করছেন ।সাধারণত যাবজ্জীবন সাজায় দণ্ডিত এমন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয় আবাসিকদের মাঝে বই বিলি করা এবং পড়া শেষে সংগ্রহ করার । খাতা করে তাঁরা হিসেব রাখেন ।

এক বছরের শেষে মনে হয় সরকারি ভাবে একটি সমীক্ষা করা দরকার । আরো ভালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে । সংশোধনাগারে সাক্ষরতা পাঠের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভবনার দিক খুলে যেতে পারে । কৃষ্ণনগরের একটি দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের বিদ্যালয়ের সঙ্গে জেলা গ্রন্থাগারের ব্যাক্তিগত স্তরে প্রাথমিক কিছু কথা হয়েছিল। তাঁদের পড়ুয়াদের ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখা পুস্তক পাঠের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ছিল এই প্রচেষ্টা। গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের সূত্র ধরেই বলা যায় যেখানে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের গ্রন্থাগারে আসার সমস্যা রয়েছে সেখানে ভ্রাম্যমান পরিষেবায় সমাধান সম্ভব । কিন্তু নদীয়া জেলা গ্রন্থাগারে মাত্র আশিটি এই ধরণের বই রয়েছে ।জেলার অন্য কোন গ্রন্থাগারে তাও নেই। আরো এই রকম বই কেনা দরকার ।পাশাপাশি বিদ্যালয়েরও সমান আগ্রহ থাকা দরকার । নদীয়া জেলায় গ্রন্থাগার বিভাগের এই শুভ উদ্যোগকে আরো প্রসারিত করার সুযোগ রয়েছে। অন্যান্য জেলাতেও শুরু করার চিন্তা ভাবনা চলছে বলে জানা গেছে । 

সঞ্জিত দত্ত

সঞ্জিত দত্ত

(লেখক পরিচিতি: সঞ্জিত দত্ত প্রাক্তন গ্রন্থাগারকর্মী। নিবাস কৃষ্ণনগর , নদীয়া । সংবাদ সাপ্তাহিক “গ্রাম গ্রামান্তর” পত্রিকার ২৫ বছর অবৈতনিক সম্পাদক ছিলেন । সম্পাদনা করেছেন ‘তীরন্দাজ নাট্যপত্র’, ‘রঙ বেরঙের আড্ডা’। লিখেছেন “সংবাদ প্রতিদিন”, “কালান্তর”, “এশিয়ান এজ” দৈনিকে । নদীয়া তথা স্থানীয় ইতিহাস চর্চার কাজে নিয়োজিত । প্রকাশিত গ্রন্থ ঃ ‘মায়াপুরঃ অতীত ও বর্তমান’ , ‘অঞ্জনা নদী তীরে ‘, ‘ফুলডোরে বাঁধা নদীয়া ও রবীন্দ্রনাথ’ , সম্পাদিত গ্রন্থ ‘সেতার’, ‘অ-শোক জীবন তিন ভুবন’, ‘কবিতার অলিন্দে জীবনের আলাপনে’, যুগ্ম গ্রন্থনাঃ ‘কৃষ্ণনগর সহায়িকা ও একনজরে নদীয়া’ (সহ লেখক গৌতম ধনী ); ‘ভারতীয় রেলের দেড়শো বছরঃ একটি সফর’ (১৮৫৩-২০০২)(সহ লেখক বিশ্বজিত দাস)।