- সুমন রায়
‘জামিন’ (Bail) – শব্দটি আমাদের সকলেরই পরিচিত। সংবাদপত্র, টেলিভিশন কিংবা আদালত সংক্রান্ত আলোচনায় প্রায় প্রতিদিনই এই শব্দটি শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে ‘জামিন’ বলতে ঠিক কী বোঝায়, কোন ক্ষেত্রে এটি অধিকার, কোন ক্ষেত্রে আদালতের বিবেচনাধীন এবং কেন একই ধরনের মামলায় একজন অভিযুক্ত জামিন পেলেও অন্যজন পান না – এই প্রশ্নগুলির উত্তর অধিকাংশ মানুষের কাছেই স্পষ্ট নয়।
প্রায়ই দেখা যায়, একই মামলায় একাধিক অভিযুক্তকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তাঁদের মধ্যে কেউ দ্রুত জামিনে মুক্তি পাচ্ছেন, আবার কেউ দীর্ঘদিন বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে রয়েছেন। আবার দুটি আপাতদৃষ্টিতে একই ধরনের মামলায় একজন অভিযুক্ত জামিন পেলেও অন্যজনের আবেদন খারিজ হয়ে যায়। এর কারণ কী? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আগে ‘জামিন’-এর আইনগত ধারণাটি বোঝা প্রয়োজন।
মজার বিষয় হল, ভারতীয় আইনে ‘জামিন’ (Bail) শব্দটির কোনও নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া নেই। সাবেক ফৌজদারি কার্যবিধি (Code of Criminal Procedure বা Cr.P.C.) কিংবা বর্তমানের ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS বা Bharatiya Nagarik Suraksha Sanhita) – কোথাও ‘জামিন’-এর পৃথক সংজ্ঞা নেই। তবে আইন অপরাধকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করেছে – জামিনযোগ্য (Bailable) এবং জামিন অযোগ্য (Non-bailable)।
ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS)-র প্রথম তপশিলে (এবং প্রয়োজনে অন্যান্য বিশেষ আইনে) যেসব অপরাধকে ‘জামিনযোগ্য’ বলা হয়েছে, সেগুলিই জামিনযোগ্য অপরাধ। অন্য সব অপরাধই জামিন অযোগ্য। সাধারণভাবে বলতে গেলে, অপেক্ষাকৃত কম গুরুতর অপরাধ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জামিনযোগ্য, আর গুরুতর অপরাধ সাধারণত জামিন অযোগ্য হয়ে থাকে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট আইনের বিধানই চূড়ান্ত।
আইনবিদদের ব্যাখ্যায়ও জামিনের মূল উদ্দেশ্য একই। Wharton’s Law Lexicon-এ বলা হয়েছে, “To set at liberty a person arrested or imprisoned, on security being taken for his appearance on a day and a place certain, which security is called bail.”
আবার Webster’s Ninth New Collegiate Dictionary বলছে, “Bail is a security given for the due appearance of a prisoner in order to obtain his release from imprisonment.”
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কোনও গ্রেফতার ব্যক্তির কাছ থেকে ভবিষ্যতে আদালতের নির্দিষ্ট তারিখে হাজির হওয়ার নিশ্চয়তা গ্রহণ করে তাঁকে সাময়িকভাবে হেফাজত থেকে মুক্তি দেওয়াকেই জামিন বলা হয়।
যিনি লিখিতভাবে প্রতিশ্রুতি দেন যে অভিযুক্তকে আদালতে যথাসময়ে হাজির করবেন, তাঁকে বলা হয় Surety বা জামিনদার। যে নথিতে জামিনের শর্ত, পরবর্তী হাজিরার তারিখ, অভিযুক্ত ও জামিনদারের স্বাক্ষর এবং বিচারকের অনুমোদন থাকে, সেটিই Bail Bond নামে পরিচিত।
জামিনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে জামিন দেওয়া আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ, এটি অভিযুক্তের আইনগত অধিকার। অভিযুক্ত আবেদন করুন বা না-ই করুন, আদালত তাঁকে জামিন মঞ্জুর করবেন। তবে শুধুমাত্র জামিন মঞ্জুর হলেই মুক্তি মিলবে এমন নয়। আদালতের নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী Bail Bond জমা দিতে পারলেই কেবল অভিযুক্ত হেফাজত থেকে মুক্তি পাবেন।
অন্যদিকে, জামিন অযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে জামিন কোনও অধিকার নয়। এখানে আদালত অভিযুক্তের আবেদন, সরকারি কৌঁসুলির বক্তব্য এবং মামলার সমস্ত পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন। ফলে ‘জামিন অযোগ্য’ মানেই কখনও জামিন পাওয়া যাবে না – এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আদালত প্রয়োজন মনে করলে এই ধরনের মামলাতেও জামিন দিতে পারেন।
জামিনের আবেদন খারিজ হওয়ার অর্থ এই নয় যে অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। বিচার শেষ হওয়ার আগে প্রত্যেক অভিযুক্তই আইনের দৃষ্টিতে নির্দোষ বলে গণ্য হন। জামিন না দেওয়ার উদ্দেশ্য একটাই— অভিযুক্ত যাতে তদন্তে বাধা সৃষ্টি করতে না পারেন, প্রমাণ নষ্ট না করেন, সাক্ষীদের প্রভাবিত বা ভয়ভীতি প্রদর্শন না করেন এবং বিচার এড়িয়ে পালিয়ে না যান।
BNSS-এর ১৮৭ ধারা অনুযায়ী, যে অপরাধে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ন্যূনতম দশ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে, সেইসব মামলায় ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দাখিল করতে না পারলে অভিযুক্ত ডিফল্ট বেল (Default Bail) পাওয়ার অধিকারী হন, যদি তিনি আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী Bail Bond দিতে সক্ষম হন। অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা ৬০ দিন।
তবে ৬০ বা ৯০ দিনের মধ্যে চার্জশিট জমা পড়ে গেলেই যে জামিনের পথ বন্ধ হয়ে যায়, তা নয়। BNSS-এর ৩৫ নম্বর অধ্যায়ের বিধান অনুযায়ী আদালত অপরাধের প্রকৃতি, তদন্তের অগ্রগতি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা করে যে কোনও পর্যায়েই জামিন মঞ্জুর করতে পারেন।
BNSS-এর ৪৭৮ ও ৪৮০ ধারায় বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটকে যথাক্রমে জামিনযোগ্য ও জামিন অযোগ্য মামলায় জামিন দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ৪৮৩ ধারায় High Court ও Sessions Court-কে একই ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।
আবার ৪৭৯ ধারায় বলা হয়েছে, যে অপরাধে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান নেই, সেইসব ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সাজাভোগের অর্ধেক সময় বিচারাধীন অবস্থায় হেফাজতে কাটিয়ে ফেলেন, তবে তিনি জামিন পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন। আর যদি তিনি পূর্বে কোনও মামলায় দোষী সাব্যস্ত না হয়ে থাকেন, তবে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য সাজাভোগের এক-তৃতীয়াংশ সময় হেফাজতে কাটালেও আদালত তাঁকে জামিন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।
বিচার শেষে যদি অভিযুক্ত দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তিনি সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন, তাহলে BNSS-এর ৪৩০ ধারা অনুযায়ী আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থাতেও আদালত তাঁকে জামিন দিতে পারেন।
এছাড়া ৪৮২ ধারায় রয়েছে আগাম জামিন (Anticipatory Bail)-এর বিধান। কোনও ব্যক্তি যদি যুক্তিসঙ্গতভাবে আশঙ্কা করেন যে তিনি কোনও জামিন অযোগ্য মামলায় গ্রেফতার হতে পারেন, তাহলে তিনি High Court বা Sessions Court-এ আগাম জামিনের আবেদন করতে পারেন। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করলে গ্রেফতারের পর তাঁকে অবিলম্বে জামিনে মুক্তি দিতে হবে।
তাহলে একই ধরনের মামলায় একজন জামিন পেলেন, অন্যজন পেলেন না— এর উত্তর কোথায়?
আসলে জামিনের কোনও যান্ত্রিক বা একরকম সূত্র নেই। আদালত প্রতিটি মামলার পৃথক বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করে সিদ্ধান্ত নেন। অপরাধের প্রকৃতি, তার গুরুত্ব, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সংগৃহীত প্রমাণ, তদন্তে সহযোগিতার মাত্রা, সাক্ষীদের প্রভাবিত করার সম্ভাবনা, প্রমাণ নষ্ট করার আশঙ্কা, পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি, অভিযুক্তের পূর্ব অপরাধের ইতিহাস, হেফাজতে থাকার সময়কাল— এই সবকটি বিষয় বিচার করেই আদালত সিদ্ধান্ত নেন।
ধরা যাক, আদালত লিখলেন-“The accused may find bail of two sureties of ₹10,000 each.” এর অর্থ, অভিযুক্তের জন্য দু’জন এমন জামিনদার প্রয়োজন, যাঁরা প্রত্যেকে ১০,০০০ টাকার আর্থিক দায়িত্ব নেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। এরপর Bail Bond-এ সমস্ত শর্ত, পরবর্তী তারিখ এবং অন্যান্য বিবরণ লেখা হবে। অভিযুক্ত ও দুই জামিনদার তাতে স্বাক্ষর করবেন। বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট Bail Bond গ্রহণযোগ্য মনে করলে তাতে অনুমোদন দেবেন এবং Release Order জারি করবেন। এরপরই অভিযুক্ত কারাগার থেকে মুক্তি পাবেন।
জামিনে মুক্তির পর অভিযুক্ত যদি আদালতের নির্দেশ অমান্য করে পলাতক হন, তবে আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন। একই সঙ্গে জামিনদারদের বিরুদ্ধে বন্ডে নির্ধারিত অর্থদণ্ডও আরোপ করা হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আদালত জামিনদার ছাড়াই অভিযুক্তকে Personal Bond-এ মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতাও রাখেন।
সবশেষে মনে রাখা প্রয়োজন, ভারতীয় সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক ব্যক্তির জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আইনসম্মত পদ্ধতি ছাড়া কাউকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না। প্রখ্যাত ব্রিটিশ বিচারপতি Sir Alfred Denning ব্যক্তিস্বাধীনতাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, একজন আইনমান্য নাগরিকের স্বাধীনভাবে চিন্তা করা, মত প্রকাশ করা এবং চলাফেরা করার অধিকারই ব্যক্তিস্বাধীনতার মূল ভিত্তি।
এই সাংবিধানিক দর্শনের প্রতিফলন ভারতীয় জামিন আইনেও স্পষ্ট। সেই কারণেই ভারতের প্রখ্যাত বিচারপতি Justice V. R. Krishna Iyer-এর বহুল উদ্ধৃত পর্যবেক্ষণ আজও সমান প্রাসঙ্গিক –
“The basic rule may perhaps be tersely put as ‘Bail, not Jail’.” অর্থাৎ, আইনের মৌলিক দর্শন কারাবাস নয়, বরং ন্যায়বিচারের স্বার্থ বজায় রেখে যথাসম্ভব ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা করা।
