– সুমন রায়
ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) শুরু হওয়ার পর থেকেই একাংশের দাবি, এই প্রক্রিয়ার কোনও আইনি ভিত্তি নেই, এটি বেআইনি। কিন্তু এই অভিযোগ কতটা সংবিধানসম্মত ব্যাখ্যার উপর দাঁড়িয়ে, আর কতটা আংশিক পাঠের ফল—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে। আইনগত কাঠামো খতিয়ে দেখলে চিত্রটি অনেকটাই ভিন্ন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
এসআইআর-কে বেআইনি বলার ক্ষেত্রে সমালোচকদের মূল যুক্তি ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২১(২) ধারা। তাঁদের দাবি, “স্পেশাল রিভিশন” কেবল একটি নির্দিষ্ট আসন বা তার অংশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, গোটা রাজ্য বা একাধিক আসনে একযোগে নয়। কিন্তু এখানেই উঠে আসছে আইনের বিস্তৃত ব্যাখ্যার প্রশ্ন। ১৯৬০ সালের ‘রেজিস্ট্রেশন অফ ইলেক্টরস রুলস’-এর ২৫ নম্বর ধারা স্পষ্ট জানাচ্ছে, এই রিভিশন হতে পারে নিবিড় (intensive) অথবা সংক্ষিপ্ত (summary) পদ্ধতিতে। ফলে, যদি স্পেশাল রিভিশন নিবিড়ভাবে করা হয়, তাকে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বলা আইনি দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক নয়—বরং বিধানের স্বাভাবিক সম্প্রসারণ।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও একটি ধারাকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সামগ্রিকভাবে পড়ে তবেই তার ব্যাখ্যা করা উচিত। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (Chief Election Commissioner) যদি বিদ্যমান বিধানগুলিকে সমন্বয় করে এসআইআর প্রক্রিয়া চালু করে থাকেন, তবে তা এক্তিয়ারবহির্ভূত বা বেআইনি বলে সরাসরি চিহ্নিত করা কঠিন। উল্লেখযোগ্যভাবে, ২১(৩) ধারা অনুযায়ী স্পেশাল রিভিশন এক বা একাধিক আসনে প্রয়োগ করা যেতে পারে—এবং একইসঙ্গে সব আসনে তা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও কোনও স্পষ্ট আইনগত নিষেধাজ্ঞা নেই।
সমালোচকদের আরেকটি বড় যুক্তি—এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান। কিন্তু বাস্তবে শীর্ষ আদালত এখনও পর্যন্ত এসআইআর-কে বেআইনি ঘোষণা করেনি। আইনজ্ঞদের বক্তব্য, যদি প্রক্রিয়াটি প্রকৃত অর্থেই অসাংবিধানিক হতো, তবে আদালত তা স্থগিত বা বাতিল করত। বরং অতীতেও দেশে বিশেষ সংশোধন হয়েছে—কখনও নিবিড়ভাবে, কখনও সংক্ষিপ্তভাবে—যদিও তখন ‘এস-আই-আর’ নামক পরিভাষাটি এতটা প্রচলিত ছিল না।
২০০২ সালের ভোটার তালিকাকে ভিত্তি ধরে পরবর্তী সংযোজনের প্রস্তাব নিয়েও বিতর্ক কম নয়। অনেকেই এটিকে অবাস্তব বলে কটাক্ষ করেছেন। তবে প্রশাসনিক মহলের একাংশ বলছে, ভুয়ো পরিচয় ও নথিপত্রের মাধ্যমে ভোটার তালিকায় অনুপ্রবেশের অভিযোগ নতুন নয়। অপরিচিত ব্যক্তিকে অভিভাবক দেখিয়ে বা নথি জাল করে নাম তোলার প্রবণতা ঠেকাতে পূর্ববর্তী তালিকা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টও ‘ইন্দ্রজিৎ বড়ুয়া বনাম নির্বাচন কমিশন’ (AIR 1984 SC 1911) মামলায় নির্বাচক তালিকা সংশোধনের সময় আগের তালিকা পর্যালোচনার গুরুত্ব স্বীকার করেছে।
এছাড়া ১৯(খ) ধারা নিয়ে যে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে—১৮ বছর বয়স এবং সাধারণ বাসিন্দা হলেই ভোটার হওয়া যায়—সেটিও সম্পূর্ণ
চিত্র তুলে ধরে না। কারণ একই আইনের ১৬(১) ধারা স্পষ্ট করে বলছে, ভারতীয় নাগরিক না হলে কেউ ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির যোগ্য নন। সংবিধানের ৩২৬ অনুচ্ছেদও ভোটাধিকারের অধিকারকে কেবলমাত্র ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। সংশ্লিষ্ট মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণও ছিল, নির্বাচক নিবন্ধককে আবেদনকারীর নাগরিকত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েই নাম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
তবে আইনি যুক্তির পাশাপাশি বাস্তবের ছবিটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূল স্তরে বহু সাধারণ মানুষ এই প্রক্রিয়ায় চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন—নথি জোগাড়, যাচাই, প্রশাসনিক অস্পষ্টতা, ট্রাইবুনাল সংক্রান্ত ধোঁয়াশা—সব মিলিয়ে বিভ্রান্তি বাড়ছে। স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং প্রয়োগের অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই, যা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
ফলে, সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে—এসআইআর প্রক্রিয়াকে ঘিরে যে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার একটি বড় অংশই আইনের আংশিক ব্যাখ্যা বনাম পূর্ণাঙ্গ পাঠের দ্বন্দ্বে দাঁড়িয়ে। প্রক্রিয়ার বাস্তব ত্রুটি ও মানুষের ভোগান্তি যেমন সত্য, তেমনই গোটা উদ্যোগটিকে সম্পূর্ণ বেআইনি বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টাও আইনগতভাবে প্রশ্নসাপেক্ষ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি নির্ভুল ও স্বচ্ছ ভোটার তালিকা যেমন অপরিহার্য, তেমনি সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রক্রিয়াটিও হতে হবে স্বচ্ছ, মানবিক এবং সুসংগঠিত—এই ভারসাম্য রক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
(সুমন রায় আইনজীবি, রানাঘাট কোর্ট)
