– সঞ্জিত দত্ত
স্থানীয়দের দাবি, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নামে পরিচিত স্টেশন সংযোগ সড়কের ঐতিহাসিক নামও যেন অপরিবর্তিত রাখা হয়। বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের ইতিহাসে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক নাটক, দেশাত্মবোধক গান এবং ‘দ্বিজেন্দ্রগীতি’ বাংলা সংগীতের এক স্বতন্ত্র ধারার জন্ম দিয়েছিল, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
মুর্শিদাবাদ জেলার নসিপুর রেলসেতু চালু হওয়ার পর কৃষ্ণনগর সিটি জংশনের গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই সম্প্রসারণের আওতাতেই ৯৯.২৪ কিলোমিটার রেলচিহ্নের কাছে অবস্থিত দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্মস্থানের প্রবেশদ্বার এবং সেখানে স্থাপিত কয়েক দশকের পুরানো আবক্ষ মূর্তিটি এখন কার্যত নির্মাণক্ষেত্রের মধ্যে পড়েছে। সম্প্রসারিত প্ল্যাটফর্মের সীমানা প্রাচীরের সংলগ্ন এই স্মৃতি-তোরণ দীর্ঘদিন ধরেই কৃষ্ণনগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। গত ছয় দশক ধরে এর সংরক্ষণের দাবি বারবার উঠলেও এখনও পর্যন্ত স্থায়ী সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে শহরবাসীর আশঙ্কা, স্টেশন আধুনিকীকরণের চাপে হয়তো হারিয়ে যেতে পারে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সঙ্গে যুক্ত শেষ দৃশ্যমান ঐতিহাসিক স্মারক—যার সঙ্গে যেমন জড়িয়ে রয়েছে কবির পারিবারিক ইতিহাস, তেমনই জড়িয়ে রয়েছে কৃষ্ণনগর রেলস্টেশনের বিকাশের ইতিহাসও, যা কিনা শহরের এক অনিবার্য সাংস্কৃতিক “ল্যান্ডমার্ক”।
ঐতিহাসিক নথি বলছে, ১৯০৪ সালে স্টেশন সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত জমির অভাবে সমস্যায় পড়েছিল তৎকালীন রেল কর্তৃপক্ষ। সেই সময় দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও তাঁর পরিবার তাঁদের পৈতৃক বাড়ির সামনের দীর্ঘ বাগানভূমির একটি বড় অংশ দান করেন, যার ফলে স্টেশন সংযোগ সড়ক বা স্টেশন এপ্রচ্ রোড নির্মাণ সম্ভব হয়েছিল। রেললাইন ও সংযোগ সড়কের মধ্যবর্তী মূল প্রবেশদ্বার এবং বসার স্থান এখনও সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কবির বৌদি মোহিনী দেবীও ‘সাধক’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছিলেন যে, স্টেশন সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য রেল কোম্পানি তাঁদের পারিবারিক ফটক অধিগ্রহণ করেছিল।
এদিকে, তথ্যের অধিকার আইনের (আর.টি.আই) আওতায় রেলের দেওয়া এক উত্তরে জানানো হয়েছে, স্টেশন চত্বরে শুধুমাত্র ভারত ছাড়ো আন্দোলনের শহিদদের নামে ফলক স্থাপনের অনুমতি রয়েছে এবং “রেল চত্বরে জাতীয় নেতাদের কোনও মূর্তি, ফলক, ম্যুরাল বা স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হবে না।” এই অবস্থান সামনে আসতেই শহরবাসীর উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, এই নীতির জেরে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্মৃতিস্তম্ভের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
১৯৬৩ সালে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্মশতবার্ষিকীতে বাংলা সাহিত্য পরিষদ স্মৃতিসৌধের প্রবেশপথে একটি স্মারক ফলক স্থাপন করে, যার উদ্বোধন করেছিলেন কবির কন্যা মায়া রায়। পরে ২০১২ সালে দ্বিজেন্দ্র পাঠাগার আরও একটি স্মারক ফলক সংযোজন করে। রেলের কর্মীরাও প্ল্যাটফর্ম নম্বর ১-এ কবির প্রতিকৃতি স্থাপন করে প্রতি বছর শ্রাবণ মাসে তাঁর জন্মবার্ষিকীতে মাল্যদান করে সেই ঐতিহ্য অটুট রেখেছেন। ১৯৬৩ সাল থেকে দ্বিজেন্দ্র স্মৃতি রক্ষা সমিতি, দ্বিজেন্দ্র পাঠাগার এবং বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনও প্রতিবছর এই স্থানে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে আসছে।
কৃষ্ণনগর কালিনারায়ণপুর রেলওয়ে প্যাসেঞ্জার ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (কে.কে.আর.পি.ডব্লিউ.এ) স্মৃতিসৌধ সংরক্ষণের দাবিতে রেল বোর্ড, রেলমন্ত্রী এবং রাজ্য সরকারের কাছে একাধিকবার আবেদন জানিয়েছে। ইতিহাসবিদ তথা কে.কে.আর.পি.ডব্লিউ.এ-র কৃষ্ণনগর ইউনিটের সম্পাদক সঞ্জিত দত্ত বলেন, “রেল কর্তৃপক্ষ-সহ সংশ্লিষ্ট সব মহলের কাছে আমরা বারবার আবেদন জানিয়েছি। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। মাতৃভূমির উদ্দেশে ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ র মতো কালজয়ী গান এবং ‘শাহজাহান’, ‘রানা প্রতাপ’, ‘চন্দ্রগুপ্ত’, ‘নূরজাহান’, ‘মেবার পতন’-এর মতো ঐতিহাসিক নাটকের স্রষ্টা এমন একজন বিরল বৈচিত্রপূর্ণ সাহিত্যিক তথা মনীষীর প্রতি এই উদাসীনতা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।”
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক কর্মী সৌমিত্র চক্রবর্তী বলেন, “রায় পরিবারের জমিদানের শেষ দৃশ্যমান স্মারক এবং কবির
রেলের স্থানীয় আধিকারিকরা জানিয়েছেন, প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণের সময় ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৈরি বর্তমান সুরক্ষামূলক ছাউনিটি সরাতে হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। রেলকর্মীদের একাংশের আশা, স্থানাভাব থাকলেও কবির আবক্ষ মূর্তিটি অক্ষত রাখা সম্ভব হবে।
সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির দাবি, রেল কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে স্মৃতিসৌধটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করুক, পুনর্নির্মাণের পর নতুন সুরক্ষামূলক ছাউনি নির্মাণ করুক, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নামে একটি উন্মুক্ত ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণ গড়ে তুলুক এবং কৃষ্ণনগর সিটি জংশনে তাঁর জীবন, সাহিত্যকীর্তি ও অবদান তুলে ধরে একটি স্থায়ী প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করুক।
সঞ্জিত দত্ত বলেন, “আমরা আশা করি, ১৯ জুলাই কবির জন্মবার্ষিকীর আগেই এই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটবে এবং রেল কর্তৃপক্ষ দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্মৃতিসৌধ সংরক্ষণের বিষয়ে স্পষ্ট আশ্বাস দেবে।”
